Friday, October 5, 2012

"রাঁধুনি"

"রাঁধুনি"

...সফিক এহসান


বাতিটা নেভাতেই মনে হল মশারির ভেতর একটা মশা ঢুকেছে। এই মশারির ভেতর মশা ঢুকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। বেশ কয়েক জায়গায় বড় বড় কয়েকটা ছিদ্র আছে। (ছিদ্র না বলে বলা উচিৎ ভোগলা।) সেগুলো দিয়ে অনায়াসে বড় সাইজের কয়েকট
া বোলতা ঢুকে পড়তে পারে। আসার সময় ভাল করে দেখার সুযোগ পাইনি। তাড়াহুড়ো করে পুরোনো ট্রাঙ্ক থেকে এই ছেঁড়া মশারিটাই নিয়ে চলে এসেছি। নতুন একটা কেনা দরকার।

পরশু থেকে অফিস। আগামীকাল বেশ কিছু কেনা কাটা করতে হবে। ঘরে প্রায় কিছু নেই বললেই চলে। টুকিটাকি মালপত্র আর কাপড়ের ব্যাগগুলো পাশের ঘরে রেখেছি। এই ঘরে কেবল পুরোনো একটা চাদরের ওপর আমি আর আমার ওপর টাঙ্গানো এই ছেঁড়া মশারিটা। তা টাঙ্গাতে গিয়েও কত ঝামেলা! বাড়িওয়ালার ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেয়ালে তিন তিনটা পেরেক গাড়তে হয়েছে। আরেকটা গাড়তে হয় নি; জানালার সাথে লম্বা রশি দিয়ে বেঁধে দিয়েছি। তবে কালকের মধ্যে একটা ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে।

শ্রবন্তী কবে আসবে তার কোন ঠিক নেই। ততদিন মেঝেতেই ঘুমাতে হবে। সেটা খুব একটা সমস্যা না। আপাতত সবচেয়ে বড় চিন্তা হচ্ছে খাওয়া। বাড়িওয়ালা ভদ্রতার খাতিরে আজকে রাতের জন্য তাদের সাথে খেতে দিয়েছেন। তাই বলে রোজ রোজ নিশ্চয়ই দেবেন না। হোটেলে যে খাব তারও কোন উপায় নেই। শ্রবন্তী বারবার নিষেধ করে দিয়েছে। ও নিষেধ না করলেও অবশ্য হোটেলে খেতাম না। হোটেলের খাবার খেলে আমার পেট ব্যথা করে, বুক জ্বলে, মাথা ঘুরে, বমি বমি লাগে- নানান ফ্যাঁকড়া!

মশাটা কানের কাছে পুন পুন করছে। বোধহয় পুরুষ মশা। শুনেছি পুরুষ মশারা নাকি রক্ত খায় না। শুধু মাঝে মাঝে পুন পুন করতে করতে কানের ভেতর ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। আমি মশাটার সাথে গল্প জুড়ে দিলাম- কী মশা ভাইজান, আছেন কেমন? আপনাদের এলাকায় নতুন আসলাম। আচ্ছা, আপনাদের এখানে হাড়ি পাতিল পাওয়া যায় কোথায় বলতে পারেন? আপনার ভাবী না আসা পর্যন্ত আমাকেই রান্না করে খেতে হবে। আর তো কোন উপায় নেই- নাকি বলেন?

মশাটা জবাব দিলো- পুন পুন, পুন পুন!

মশার সাথে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ একটা জরুরী কথা মনে পড়ে গেল। পৌঁছেই শ্রাবন্তীকে একটা ফোন করার কথা ছিলো, করা হয়নি। আমার মোবাইলের চার্জ শেষ। চার্জ যে করবো তারও কোন উপায় নেই। এই ঘরের সকেটটা নষ্ট। বাড়িওয়ালা বলল কাল-পরশু নাগাদ ঠিক করিয়ে দেবেন। ওদিকে ও বোধহয় চিন্তায় অস্থির হয়ে যাবে।

হয় হোক; একটু শিক্ষা হওয়া দরকার। একমাস আগে থেকে বলে রেখেছি- আমার বদলির অর্ডার হয়ে গেছে, তোমার অফিস থেকে বদলির ব্যবস্থা কর। তা তার অফিস থেকে নাকি ব্যবস্থা করা যায়নি। ফালতু একটা অফিস; কাজের থেকে কথা বেশি হয়! বলেছিলাম চাকরিটা ছেড়ে দিতে। আমার বেতনের টাকা দিয়ে ভাল ভাবেই চলে যাবে। সে তাও করবে না। শ্রবন্তী নারী অধিকারে বিশ্বাসী। শুধু স্বামীর সংসার করার জন্যই নাকি নারীদের জন্ম হয়নি। তার মেধাকে কাজে লাগাতে দিতে হবে। এর ওপর হস্তক্ষেপ তার পছন্দ নয়। আমাকে একা পাঠিয়ে দিয়ে বলেছে একমাসের মধ্যে সে যে করেই হোক এখানে বদলির ব্যবস্থা করবে। ততদিন আমি একা একা কী করে থাকি? এই জন্যেই বিয়ের পর মা মেয়েদের চাকরি করা একদম পছন্দ করেন না। আমারই ভুল হয়েছে মার কথা তখন না শুনে।

নতুন জায়গায় ঘুম সহজে আসতে চায় না। তার ওপর মেঝেতে শুয়ে অভ্যাস নেই। তবুও সারা দিনের ক্লান্তিতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার কানের কাছে পুরুষ মশাটা পুন পুন করে উড়তে লাগলো।

আজ সকালে বেশ কিছু হাড়ি পাতিল কিনেছি। দাম বেশি নিলো কিনা বুঝতে পারছি না। চুলাটার দাম যে বেশি নিয়েছে কোন সন্দেহ নেই। এইটুকুন একটা স্টোভের দাম চারশ’ আশি টাকা হতেই পারে না। তবে চাল ডালের দাম তুলনামূলক কম। রান্না-বান্না করতে কী কী লাগে তাও জানি না। তিনবার করে বাজারে গিয়েছি। তারপরও রান্নার সময় দেখি হলুদ নেই। বাধ্য হয়ে হলুদ ছাড়াই ডাল রেধেছি। প্রচন্ড ঝাল আর তৈলবিহীন সেই সাদা পানীয় আমি এই জীবনে আর কখনো খাইনি। একটা ডিম ভেজেছিলাম। ভুলে তাতে লবণ দেয়া হয়নি। একমাত্র ভাতটাই ভাল রেঁধেছি। একটু শক্ত শক্ত হলেও ঝাল-লবণ ঠিক ছিলো। এই দিয়ে কোন রকমে দুপুরে পেটের ক্ষুধা মিটিয়েছি। কিন্তু রাতে কী করব তাই ভাবছি। ঐ ডাল নামক সাদা পানীয়টা দ্বিতীয়বার খেতে ইচ্ছে করছে না। রান্না করা যে এতো কষ্টের কাজ স্বপ্নেও কখনও ভাবিনি।
আমার সব রাগ গিয়ে পড়লো শ্রাবন্তীর ওপর। ওর জন্যই আমার এতো দুর্ভোগ। সকালে বাজার থেকে ফোন করেছিলাম। সে বদলির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। ইনশাল্লাহ আগামী মাসের মধ্যে সে চলে আসবে। কথার ঢং শুনলে গা জ্বলে যায়!

বিকেলের দিকে একটা গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দরজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দে ঘুম ভাঙলো। খুলে দেখি বাড়িওয়ালা এসেছেন। ভদ্রলোকের নাম মোছাদ্দেক আলী। দোতলার ফ্ল্যাটে স্ত্রী নিয়ে থাকেন। কোন ছেলে মেয়ে নেই। সন্ধ্যার দিকে তিনি ঘুরতে বের হন। প্রত্যেক ফ্ল্যাটে গিয়ে গিয়ে ভাড়াটেদের খোঁজ খবর করেন। আমাকে দেখে বললেন: ঘুমিয়েছিলেন নাকি? বিরক্ত করলাম বোধহয়।

আমি তাড়াতাড়ি দরজা ছেড়ে দিয়ে বললাম: আরে না তাতে কী হয়েছে? আসুন ভেতরে আসুন।

মোছাদ্দেক সাহেব ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন: মালপত্র দেখি কিছু আনেননি এখনও।

আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। ঘরে আসবাবপত্র বলতে কিছু নেই। এক কোনায় শুধু একটা মাদুর বিছানো; ওটার ওপর এতোক্ষণ আমি শুয়ে ছিলাম। তাকে আমি কোথায় বসাই?

মোছাদ্দেক সাহেব নিজেই আমার সমস্যার সমাধান করে দিলেন। সরাসরি মাদুরের ওপর বসে পড়ে বললেন: ভাবীকে কবে আনবেন?

আমিও বসতে বসতে বললাম: এইতো, মাসখানেকের মধ্যেই।
: নতুন বাসা কেমন লাগছে? কোন অসুবিধা হচ্ছে নাতো?
: না, এমনিতে ফ্ল্যাটটা চমৎকার, কোন অসুবিধা হচ্ছে না। তবে আপাতত খাওয়া দাওয়াটাই সমস্যা। আপনাদের এদিকে কাজের লোক পাওয়া যায় না?

মোছাদ্দেক সাহেব চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা চুলকিয়ে বললেন: অল্প কয়েকদিনের জন্য লোক পাওয়া মুস্কিল। তবে দেখি কী করা যায়।

ভদ্রলোক অনেকক্ষণ পর্যন্ত গল্প করলেন। কোন ফ্ল্যাটের লোকজন কেমন সে সম্পর্কে আমাকে ধারনা দিলেন, এই বাড়িটা করতে গিয়ে কত সমস্যায় পড়েছেন তার খুটিনাটি বিবরণ দিলেন। আরও কতো প্যাঁচাল!

তবে লোকটি সত্যিই ভদ্রলোক। না করা সত্ত্বেও জোর করে তাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে রাতের খাবারটা খাইয়ে দিলেন।

পরদিন সকাল বেলা। অফিসে যাবার জন্য তৈরী হচ্ছি। দেখি বাড়িওয়ালা বার-তের বছরের একটা ছেলে নিয়ে হাজির। ছেলেটার নাম রাসেল; এতিম। বড় রাস্তার পাশের একটা হোটেলে টেবিল মোছার কাজ করতো। আজ সকালে একটা কাঁচের প্লেট ভেঙে ফেলার অপরাধে চাকরিটা চলে গেছে। ঘরের সব কাজ করতে পারে। টুকটাক রান্না-বান্নাও নাকি জানে। তিনবেলা খাওয়া-পড়া দিলেই চলবে, কোন বেতন লাগবে না। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ওর ওপর বাজার-ঘাট, রান্না-বান্নার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আমি অফিসে গেলাম।

সন্ধ্যাবেলা এসে দেখি ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর ঘুম ঘুম চোখে রাসেল দরজা খুলল। আমি অবাক হলাম: এতো সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়েছিস! খাবার-দাবারের খবর কী?

রাসেল চোখ কচলে হাসি মুখে জানালো: খবর খুব ভালো খালুজান। ওস্তাদের কাছ থিকা আমি সব রান্নাই হিগছি। খাইয়্যা দেখেন কিমুন টেষ্ট অইছে।

আমি হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম। আয়োজন নেহাত খারাপ করেনি। আলু ভর্তা, পটল ভাজি, ছোট মাছের তরকারি আর ডাল। খেতে গিয়ে আমার মুখ বেকে গেল। রাসেলের রান্নার হাত আমার মতোই- “ভাল”। আলু ভর্তার আলু কাঁচা কাঁচা রয়ে গেছে। পটল ভাজিতে লবণ দিতে মনে ছিলো না। তরকারিতে হলুদটা একটু বেশি হয়ে গেছে। তবে ডাল আর ভাত ফার্ষ্ট ক্লাস।

খেতে খেতে রাসেল বলল: পরথম দিন তো তাই দিশা পাই নাই। কাইল আর এমুন রান্না খাইতে অইব না। সব সাইজ কইর‌্যা ফালামু, দেইখেন ভাইজান।

ছেলেটার স্মৃতিশক্তি কম। সকালে যখন এসেছিলো তখন আমাকে মামা ডেকেছে। খেতে বসার আগে ডেকেছিলো খালুজান। এখন আবার ভাইজান ভাইজান করছে। সেটা কোন সমস্যা না। আমার দরকার ওর রান্না; এর পর যদি খালাম্মাও ডাকে তাতেও কিছু এসে যায় না!

পরদিন অবশ্য সত্যি সত্যি ওর অদক্ষ হাতের রান্না আমাকে আর খেতে হয়নি। কারণ, সকাল বেলা উঠেই দেখি ঘরের দরজা হাট করে খোলা। রাসেল আমার মানিব্যাগ আর হাত ঘড়িটা নিয়ে উধাও। টেবিলের ওপর আমার মোবাইলটা ছিলো, সেটা তেমনি পড়ে আছে। বোধহয় ওটার দাম সম্পর্কে ওর কোন ধারনা নেই। ভাল করে খুঁজে দেখলাম আরও কিছু নিয়েছে কিনা। কাপড়ের ব্যাগের পকেটে হাজার পাঁচেক টাকা ছিলো। সেগুলো ঠিকই আছে। নেবার মধ্যে শুধু সেই ছেঁড়া মশারিটা নিয়ে গেছে। এতো কিছু থাকতে ঐ মশারিটা ওর পছন্দ হলো কেন সে এক রহস্য।

বাড়িওয়ালাকে বলতেই তিনি গম্ভীর ভাবে মাথা দুলিয়ে বললেন: বড্ড ভুল হয়ে গেছে ভাই সাহেব। কোন কিছু না জেনে শুনে এভাবে রাস্তার একটা ছেলেকে কাজে নেয়া উচিৎ হয়নি। আপনি বরং এক কাজ করুন- ভাবী না আসা পর্যন্ত আপনি বরং আমাদের সাথেই খাবেন।

আমি হাসি মুখে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম। অন্যের ওপর বোঝা হয়ে থাকাটা আমার পছন্দ নয়। অফিস থেকে ফেরার সময় একটা রান্না শেখার বই নিয়ে আসলাম। বইয়ের নাম- ‘১০১টি বাঙালী খাবার’। রাতে আর রান্না করতে ইচ্ছে করলো না। কোন রকমে গুড়-মুড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

পরদিন শুক্রবার। সকালে চা বিস্কুট দিয়ে নাস্তা করে ‘১০১টি বাঙালী খাবার’ খুলে বসলাম। বেশ অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম অধিকাংশই চাইনিজ কিংবা থাইল্যান্ডের খাবার। বাঙালী খাবার যাও কিছু আছে তাদের মধ্যে ডাল- আলু ভাজি এসব কিছু নেই। সব কাবাব, স্যুপ আর হালুয়ার আইটেম। অনেক ঘেটে ঘুটে একটা মুরগির আইটেম পাওয়া গেল। ছুটির দিনে মুরগির আইটেমটা খারাপ হবে না। কাজেই চটপট লিষ্ট তৈরী করে বাজারে চলে গেলাম।

কিন্তু বইয়ের দেওয়া লিষ্টের অধিকাংশ মসলা-পাতিই পাওয়া গেল না। দুই একটার তো নামই শুনিনি কোনদিন। তবুও যা পাওয়া গেল তাই দিয়েই রান্না বসিয়ে দিলাম। রঙ চেহারা মোটামুটি ভালই দেখতে। খেতে কেমন হবে কে জানে!

কিন্তু ভাত রান্না করতে গিয়ে হলো এক বিপত্তি। ভাতের মাড় গালতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেললাম। বাবাগো বলে চিৎকার দিয়ে ভাতের পাতিল উপুড় করে ফেলে রেখেই এক গামলা পানিতে হাত চুবিয়ে ধরলাম। ঘরে কোথায় যেন একটা মলম ছিলো; প্রয়োজনের সময় সেটা খুঁজে পাওয়া গেল না। ঝামেলার ওপর ঝামেলা। দরজায় কে যেন কড়া নাড়ছে। বিরক্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম: কে?

কোন উত্তর এলো না। শুধু আগের থেকে আরও জোরে কড়া নাড়তে লাগলো। ভিক্ষুক-টিক্ষুক হবে হয়তো। আমি বিরক্তির সাথেই দরজা খুললাম। এবং দরজা খুলেই আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম: আরে- তুমি!

দরজার ওপাশে শ্রবন্তী হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে বলল: চলে এলাম। তুমি ভালো আছো?

কেন জানি না, ওকে দেখে খুশিতে আমার চোখে পানি এসে গেল। তাই দেখে শ্রাবন্তী বলল: কি ব্যাপার কাঁদছো কেন?

আমি মাথা ঝাকিয়ে বললাম: ধুর! কোথায় কাঁদছি? আসলে পেঁয়াজ কাটছিলাম তো!
----------০----------

No comments:

Post a Comment